জাফরুল্লাহ্ চৌধুরী |::‘দুঃখের দিনে পাখিরা কি গান গাইবে? বিষাদের গান গাইবে’!- বারটোল্ট ব্রেখ্ট, জার্মান দার্শনিক, নাট্যকার ও প্রাবন্ধিক

বিপন্ন পণ্য: বিশ্ব পুঁজিবাদ

সম্প্রতি পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে দ্রুত গতিতে ধনী-দরিদ্রের মধ্যে বৈষম্য বেড়ে উল্কার বেগে ছুটছে। ফলে অনেক রাতকানা দার্শনিক, রাষ্ট্রবিজ্ঞানী গভীরভাবে প্রচার করতে শুরু করেছেন যে, সাম্যবাদী সম-সুযোগের সমাজ ব্যবস্থার সম্ভবত কোনো ভবিষ্যৎ নেই। ‘কার্ল মার্কস ইজ ডেড’, বেইজিংয়ের তিয়ানমিয়ান স্কয়ারে বিস্মৃত মাও সে তুং, হোচিমিন সিটির স্কয়ারে শায়িত হো চি মিন। হাভানা স্কয়ারের কোথাও নেই ফিদেল ক্যাস্ত্রোর ভাস্কর্য, তবু তার উপস্থিতি অনুভবনীয়, চুরুটবিহীন হাসিও আকর্ষণীয়। হাভানার বহু জায়গায় চে গুয়েভারা দৃশ্যমান, চিরতরুণ। কৃষক শ্রমিকের লাল ঝান্ডা কি আর উড়বে না? বিশ্ব পুঁজিবাদ হঠাৎ ভয়ানক ধাক্কা খেল এক অজানা, অদৃশ্য কিন্তু সর্বত্র বিরাজমান ক্ষুদ্র ভাইরাস নভেল করোনা কভিড-১৯ এর কাছে। প্রায় অজানা করোনাভাইরাস সারা পৃথিবীকে দাবড়িয়ে তুলোধুনো করেছে। ধনী, দরিদ্র, সৎ, দুর্জন, দুর্নীতিপরায়ণ রাজনীতিবিদ, আমলা, শিক্ষক, কৃষক-জনতাকে- কারো পালাবার পথ নেই।

করোনাভাইরাস ছাত্র, শ্রমিক সবাইকে একটি কঠিন প্রশ্ন ছুড়ে দিয়েছে রাষ্ট্র ন্যায়ভিত্তিক সমাজ ব্যবস্থায় ফিরে আসবে তো?

প্রবৃদ্ধি ও উন্নয়ন মূল কথা নয়, মূল কথা সুন্দর জীবন-জীবিকা এবং জীবনের সব ক্ষেত্রে সব নাগরিকের সমঅধিকার ও সমসুযোগ। যার অনুপস্থিতির কারণে কি করোনাভাইরাসের প্রতিশোধমূলক প্রয়াস, যার থেকে কারো রক্ষা নেই? ফরাসী মার্কসীয় অর্থনীতিবিদ টমাস পিকেটি কী ভাবছেন? নাকমুখে রক্ত সঞ্চার স্বাস্থ্যের লক্ষণ নয়, বরঞ্চ মৃত্যুর সিগনাল। লুটেরা মুৎসুদ্দি শ্রেণি আজ সাধারণ মানুষের দুর্ভাগ্যের কাতারে দাঁড়াতে বাধ্য হচ্ছে। বাংলাদেশ থেকে পালিয়ে যাওয়ার তাদের কোনো পথ খোলা নেই। উন্নয়নের স্বপ্নের রাজ্যে বসবাসকারী বাংলাদেশি দুর্নীতিবাজ রাজনীতিবিদরা হঠাৎ দিশেহারা হয়ে পড়েছেন, চোখে অন্ধকার দেখেছেন। অন্ধকার রুমে কালোবিড়াল খুঁজে বেড়াচ্ছেন। মুক্তি যেন সদূর পরাহত।

তিন মাসের মধ্যে বাংলাদেশে করোনা সংক্রমণ চীনের উহানকে ছাড়িয়ে গেছে, শিল্প ও স্বাস্থ্যখাত পুরোপুরি বিপর্যস্ত। কেবল সুষ্ঠুভাবে চালু আছে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল, কুর্মিটোলা জেনারেল হাসপাতাল, কুয়েত মৈত্রী, সিএমএইচ এবং কয়েকটি সরকারি মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল। দেশের সবচেয়ে বড় চিকিৎসা শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বিএসএমএমইউ হাসপাতাল সম্পর্কেও প্রশ্ন উঠেছে। হাতাহাতির ঘটনা ঘটেছে, কয়েক শিক্ষকের করোনা মৃত্যুর ঘটনায়, প্রায়‘লকডাউন’।

স্বাস্থ্য ব্যয় বিল এবং অক্সিজেনের স্বল্পতার আলাপ নাই বা হলো। দেশের প্রায় পাঁচ হাজার ইউনিয়ন স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ কেন্দ্রের ১০ ভাগ কেন্দ্রে একজন ডাক্তারও সার্বক্ষণিকভাবে অবস্থান দূরে থাকুক, নিয়মিত উপস্থিত থাকেন না। ঝড় উঠবে সেখানে। অর্থনীতির সংবাদ আরও দুর্বিষহ।

বোমা ফাটিয়েছে সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ (সিপিডি)- দরিদ্রতার হার ২০ থেকে বেড়ে ৩২ শতাংশ হবে। উন্নয়ন অন্বেষণের পরিচালক ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক রাশেদ তিতুমীরের হিসেবে এই বছরই বাংলাদেশে দরিদ্রতা বেড়ে ৪২-৪৩ শতাংশে পৌঁছাবে। ভয়ানক তথ্য, হিসাবে খুব ভুল নাও হতে পারে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার হিসেবে বাংলাদেশে অন্যূন ৫০ লাখ ব্যক্তি করোনায় আক্রান্ত হবে। অতিরিক্ত ২ কোটি দরিদ্র ও নিম্নবিত্ত পরিবার খাদ্য সংকটে আছে, তাদের আয় ভয়ানকভাবে কমেছে, দ্রুত অবস্থার পরিবর্তনের সম্ভাবনা নেই। এসব সমস্যার মূলে রয়েছে সুশাসনের অভাব ও গণতন্ত্রহীনতা এবং লাগামহীন দুর্নীতি। জনপ্রতিনিধিরা পাপি, আমলারা নিষ্পাপ। আইনশৃঙ্খলাবাহিনী ‘ট্রিগার হ্যাপি’। উহানে করোনার ঢেউ দেখে এসএ টিভির মার্চের (২০২০) টকশোতে প্রধানমন্ত্রীকে সতর্ক করে আমি বলেছিলাম, ‘ঝড় আসছে, হাসপাতাল সামলান, ভেন্টিলেটর নয়, বেশি প্রয়োজন নেবুলাইজার ও পর্যাপ্ত অক্সিজেন সরবরাহ’ এবং ‘একমাসের মধ্যে দ্রুত প্রশিক্ষণ দেওয়া কয়েক হাজার সার্টিফিকেটধারী অবেদন চিকিৎসক (অ্যনেসথেটিস্ট) যারা ভেন্টিলেটর চালাবেন, ইনটুবেশন করবেন এবং যাদের শ্বাসনালী (ট্র্যাকসটমি) দ্রুত কেটে বাতাস প্রবেশের দক্ষতা থাকবে’। মূল সমস্যায় নজর না দিয়ে কভিড চিকিৎসার চিকিৎসক ও সেবিকাদের ৩-৫ তারকা হোটেলে থাকা নিয়ে সময়ক্ষেপণ করলেন। প্রাইভেট হাসপাতালের সাথে লেনদেন করলেন, দুর্নীতির প্রশ্রয় দিলেন, সেবা নিশ্চিত করলেন না। নিবেদিত চিকিৎসক ও স্বাস্থ্যকর্মীদের সম্মান দিলেন না। যারা পালাচ্ছে তাদের উপঢৌকন দিলেন, অব্যবস্থাপনার মাধ্যমে অধিকতর  দুর্নীতি ও অজুহাতের সুযোগ করে দিলেন।

বার বার অনুরোধ করা সত্ত্বেও গণতন্ত্রের মানসকন্যা একবারও সর্বদলীয় রাজনৈতিক আলোচনার উদ্যোগ নিলেন না। আপনার রাজনৈতিক কর্মীদেরও বিশ্বাস করতে পারছেন না, কিন্তু কেন? কোথায় সংশয়, আপনার এত ক্ষোভ কেন, দুঃখ কোথায় লুকিয়ে আছে? গোয়েন্দা নির্ভরশীলতা অজান্তে বিপদ ডেকে আনে। আপনার এত কঠোর পরিশ্রম, সজাগ দৃষ্টি, দেশের জন্য পিতার ন্যায় অফুরন্ত ভালোবাসা, দেশের জন্য পুরো সুফল আনছে না কেন, ভেবে দেখেছেন কি? দেশবাসী আপনাকে ভালোবাসে, তারা আরো একজনকে ভালোবাসে, তিনি খালেদা জিয়া। তিনি আপনার সমতুল্য না হলেও দেশের কঠিন বিপদ থেকে উত্তরণের জন্য আপনার খালেদা জিয়ার সঙ্গে সাক্ষাত প্রয়োজন, অতীতের ন্যায় মহানুভবতা প্রদর্শন করুন। তার সুস্থতা কামনা করে আসুন, দুজনে মিলে জনকল্যাণকর সুশাসিত গণতান্ত্রিক আনন্দের বাংলাদেশ গড়ে তোলার পরিকল্পনা নিন, সুষ্ঠু নির্বাচন নিশ্চিত করুন।

অতর্কিত করোনা সংক্রমণে বাংলাদেশে কয়েকজন মন্ত্রীর উক্তি বৈসাদৃশ্য। করোনা সংক্রমণের দ্বিতীয় ও তৃতীয় প্রবাহ হবে ভয়ানক যা দ্বারপ্রান্তে অথচ আমাদের পর্যাপ্ত প্রস্তুতি নেই। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমিরের উন্নয়ন অন্বেষন ২০২০-২১ বাজেট সম্পর্কিত তথ্য-উপাত্ত আলোচনায় দেখিয়েছেন যৌক্তিক প্রবৃদ্ধি ৪ দশমিক ২ শতাংশের অধিক সম্ভব নয়, উৎপাদনশীল জিডিপি কমবে ১২ দশমিক ৪শতাংশ, প্রবাসী রেমিটেন্স আয় কমেছে, কয়েক দেশে প্রবাসী অভিবাসী বাংলাদেশীদের কর্মচ্যুতি ঘটেছে। ১৭৪ রাষ্ট্রে বাংলাদেশের এক কোটি বিশ লাখ অভিবাসী কাজ করেন, সেখানে কর্মসংস্থান বাড়ছে না, বরঞ্চ কমছে এবং পোশাক শিল্পের আয় স্থবির হয়ে পড়েছে, নীরব ছাঁটাই চলছে, শিক্ষায় সবার সমান সুযোগ নেই, সামাজিক সুরক্ষা সুবিধা ভোগ করে মাত্র ৯৬ লাখ পরিবার। প্রাপ্তির সঙ্গে আছে দুর্নীতির উইপোকা, বেকারত্ব বাড়ছে ৩ শতাংশ হারে, অসহায়ত্ব শিক্ষিত বেকারদের।

২০২০-২১: দুঃসময়ের বাজেট কিন্তু আলোচনায় উত্তাপ নেই

দুঃসময়ে গতানুগতিক বাজেটে উত্তীর্ণ হওয়া যায় না। বৃহত্তর জনগোষ্ঠীর কল্যাণ অবসৃত থাকে, পর্যাপ্ত পুষ্টির অভাবে কর্মদক্ষতায় ও প্রতিযোগিতায় পিছনে পড়ছে বাংলাদেশের শ্রমিকের উৎপাদন ক্ষমতা। প্রধানমন্ত্রীকে গণতান্ত্রিক আলোচনায় দেখা যায়নি ১৪ দলের সভায়, অধিকাংশ সময়ে তিনি ছিলেন আমলা পরিবৃত্ত, রাজনৈতিক সহকর্মীরা ম্রিয়মান। মৃত ব্যক্তির বন্দনা আছে, সঙ্গে আছে ঢাক-ঢোলের বাজনা অথচ কর্মীদের হৃদয়ে নেতার আকুতি অনুপস্থিত।

এক নাগাড়ে ২০ দিন গণস্বাস্থ্য নগর হাসপাতালে চিকিৎসক ও প্যারামেডিকদের অতুলনীয় সেবা ও জনগণের ক্রমাগত দোয়ায় করোনা মুক্ত হয়ে সরাসরি ১৪ জুন ২০২০ তারিখে বনানী কবরস্থানে গিয়েছিলাম মুক্তিযুদ্ধের সতীর্থ নাসিমকে শেষ অভিবাদন জানাতে। তখন রাষ্ট্রপতির গার্ড রেজিমেন্টের শ্রদ্ধাজ্ঞাপন পর্ব চলছিল। শহীদ তাজউদ্দিন, নজরুল ইসলাম ও ক্যাপ্টেন মনসুর আলীর কবর জিয়ারত না করে আওয়ামী লীগ কর্মীরা ফিরে গেলেন। বেগম ফজিতুলন্নেসার কবরের সামনে দাঁড়িয়ে কাউকে দোয়া করতে দেখলাম না। অধিকাংশ রাজনৈতিক কর্মী জানে না বনানী কবরস্থানে শায়িত আছেন মুক্তিযুদ্ধের বীর সেনানী প্রবাসী সরকার। কী দুর্ভাগ্য জাতির।

১) দেশের এতজন বিজ্ঞ অর্থনীতিবিদ, রাষ্ট্রবিজ্ঞানী, ব্যাংকার, শিক্ষক, বুদ্ধিজীবি বা রাজনীতিবিদ কেউ সাহস করে সত্য কথা জনসাধারণকে জানাচ্ছেন না। সবাই প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশের অপেক্ষমাণ।

২) বিএনপি তাদের স্ট্যান্ডিং ও উপদেষ্টা কমিটির সভায় অর্থমন্ত্রীর বক্তব্য নিবিড়ভাবে পড়ে,অধ্যয়ন করে একাধিক আলোচনা সমালোচনা করে মননশীল সুষ্ঠু সুপারিশ সরকারকে জ্ঞাত না করে ভুল করছেন। দেশকে তো বাঁচাতে হবে। এ দায়িত্ব খালেদা জিয়ারও।

৩) জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের সাংসদরা মুখে কলুপ বেঁধেছেন কেন? সুচিন্তিত বাগ্মিতায় সংসদ উত্তপ্ত রাখুন, ভয় পাবেন না, নির্ভয়ে দায়িত্ব পালন করুন। সংখ্যার চেয়ে সাহস বড়।

৪) এরশাদ সাহেব বেঁচে থাকলে বাজেটের প্রতিটি অধ্যায় পড়ে-বুঝে উপযুক্ত সমালোচনা উন্মুক্ত করতেন। জি এম কাদেরের মতো আচরণ করতেন না। জি এম কাদের অনুগ্রহ করে ‘হুক্কা হুয়া’ করা বন্ধ করুন। জাতীয় পার্টির ভবিষ্যৎ গড়ার জন্য আপনার অনেক কাজ বাকি।

৫) জনাব ওবায়দুল কাদের বিরোধী দলীয় সব সমালোচনার উত্তর দিতে হয় না। এটা রাজনৈতিক অসহিষ্ণুতা, অর্থমন্ত্রীকে উত্তর দেওয়ার সুযোগ দিন। বাজেট অর্থমন্ত্রীর দায়িত্ব, আপনার নয়।

৬) মাননীয় প্রধানমন্ত্রী, সর্বদলীয় রাজনৈতিক সভা ডাকুন, বিপদমুক্তির বাজেট উদ্ভাবনের জন্য। নতুবা কোনো লাভ হবে না দেশের না দেশবাসীর, ওষুধের দাম কমবে না, কৃষক শ্রমিক তার শ্রমের ন্যায্য মূল্য পাবে না, আইসিইউ প্রতারণা বাড়বে, মৃত্যুর পরও চিকিৎসার বিল দিতে হবে, ফড়িয়ারা রাজত্ব করবে, শহরবাসী অত্যাধিক মূল্যে ফলমূল,শস্য কিনে প্রতারিত হবেন। স্বাস্থ্যখাতে নৈরাজ্য অব্যাহত থাকবে, ক্ষুধা-দারিদ্র বাড়বে, সঙ্গে যৌন নিপীড়ন, নৈরাজ্য ও ব্যাপক দুর্নীতি। মুখ থুবড়ে পড়বে বঙ্গবন্ধুর জন্ম শতবার্ষিকী।

পরিশোধতব্য সুদ ২০২০-২১ বাজেটে

আন্তর্জাতিক সংস্থার প্রাপ্য বিদেশী ঋণের সুদ এবং পিপিপি (পাবলিক প্রাইভেট পার্টনারশিপ) ভর্তুকি ও দায়বদ্ধতা পরিশোধ করতে এক লাখ চার শ এগার কোটি টাকা প্রয়োজন যা ২০২০-২১ বাজেটের মোট বরাদ্দের ১৭ দশমিক ৬৮ শতাংশ। খাদ্য, দুর্যোগ, কৃষি, পানি সম্পদ ও স্থানীয় সরকারের মোট বরাদ্দের ১৩ দশমিক ৩৬ শতাংশের চেয়ে ২৫ হাজার কোটি টাকা বেশি। স্বাস্থ্যসেবা ও পরিবার কল্যাণ, প্রাথমিক ও গণশিক্ষা এবং মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষায় বরাদ্দ মাত্র ৭৯৯৪১ কোটি যা বাজেটের ১৪ দশমিক ২৫ শতাংশ। স্মরণতব্য ঋণ পরিশোধের জন্য প্রয়োজন ১৭ দশমিক ৬৮ শতাংশ বরাদ্দ। সংসদে এই সম্পর্কে প্রশ্ন না ওঠা দুর্ভাগ্যজনক। পরিশোধতব্য বিদেশী ঋণের বিষয়টি জনসাধারণের শিক্ষায় অন্তর্ভুক্ত করার ব্যাপারে বিএনপি তথা জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের নেতৃবর্গের ব্যর্থতা রাজনীতিতে তাদের অপরিপক্কতার পরিচায়ক এবং দুঃখজনক। বাংলাদেশের জনপ্রশাসন মাথাভারী, নিত্য-নতুন সিনিয়র সচিবের জন্ম হচ্ছে, বাজেটের মোট বরাদ্দের প্রায় এক পঞ্চমাংশ জনপ্রশাসনে। ভোটারবিহীন নির্বাচনের জন্য এনাদের উর্বর মস্তিষ্ক খুব কার্যকর।

আমাদের স্বপ্নদ্রষ্টা নেতা শেখ মুজিবুর রহমানের মন, মনন, মহানুভবতা, চিন্তা, চেতনা ও ভালোবাসার ঘ্রাণ নিতে আওয়ামী লীগ, যুব লীগ, স্বেচ্ছাসেবক লীগ, ওলামা লীগ সবাই অক্ষম, অন্ধ, বধির।

আওয়ামী লীগ, যুব লীগ কর্মীরা যদি শেখ মুজিবকে ভালোবাসেন তবে ১৯৭৫ সনের ১৭ জুলাই মাসের নির্দেশনামা অক্ষরে অক্ষরে পালন করা হবে তাদের নৈতিক দায়িত্ব ও কর্তব্য। শেখ মুজিব গ্রামের মানুষকে ভালোবাসতেন নিজের চেয়েও বেশি, তাদের দুঃখমোচন ও ক্ষমতায়ন ছিল তার স্বপ্ন। এবারের বাজেট হওয়া উচিত শেখ মুজিবের স্বপ্নের বাস্তবায়ন, স্বনির্বাচিত স্থানীয় প্রশাসন, দূর্নীতিমুক্ত সমঅধিকারে সুশাসিত গণতান্ত্রিক বাংলাদেশ। শেখ মুজিবুরের মহানুভবতা আত্মস্থ করতে আওয়ামী লীগের অধিকাংশই অক্ষম। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা মৌলিক সংস্কারের বিকল্প নেই। পিতার স্বপ্নের বাস্তবায়ন করুন। আমলাদের বেশি বিশ্বাস করতে নেই। স্বচ্ছ রাজনীতি আপনার বর্ম ও ধর্ম।

শেখ মুজিবুর রহমানের স্বপ্ন ও ভালোবাসা

দলমত নির্বিশেষে সব রাজনৈতিক কর্মী এবং গ্রাম-গঞ্জের সাধারণ কৃষক শ্রমিকের জন্য ছিল শেখ মুজিবুরের অফুরন্ত ভালোবাসা। তার হৃদয়ের দরজা ছিল সবার জন্য উন্মুক্ত। তাদের খাদ্য নিরাপত্তা দেওয়া, কৃষক-শ্রমিক সন্তানের শিক্ষা ও অধিকার প্রতিষ্ঠা ছিল তার জীবনের ব্রত। সবাই তার একান্তজন, আত্মীয় তুল্য। যাকে একবার শেখ মুজিব দেখেছেন, তাকে তিনি স্মরণ রেখেছেন স্নেহডোরে। কেন্দ্রিকতা তাকে করাচি ও ইসলামাবাদের শাসনের কথা বারে বারে স্মরণ করিয়েছে নির্মমভাবে। পাকিস্তানের কেন্দ্রিকতা পূর্ব পাকিস্তানবাসীর সমসুযোগ ও সম-উন্নয়নের প্রধান বাধা ছিল। যানজট, শাসনজট ও সময়মতো স্বাস্থ্যসুবিধা থেকে বঞ্চণার নির্মম মাফিয়া শাসন। পাকিস্তান ভাঙ্গার অন্যতম কারণ কেন্দ্রিকতা, ধর্মের অপব্যবহার এবং কেন্দ্রিকতা দুর্নীতির সোপান। মুখে রক্ত সঞ্চারের মতো। শহরের সব সুযোগ নিশ্চিত করতে চেয়েছিলেন শেখ মুজিব গ্রামবাসীদের জন্য, সঙ্গে নির্মল বাতাস ও লোকজ সংস্কৃৃতির বিস্তার।

তৃণমূলের অধিকার আদায় ও জবাবদিহিতামূলক গণতান্ত্রিক সরকার প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে ৬৪ জেলায় ৬৪ গর্ভনর নিয়োগ দিয়েছিলেন শেখ মুজিবুর রহমান ১৯৭৫ সনের ১৭ জুলাই। আগস্ট মাস অবধি চলছিল গভর্নরদের প্রশিক্ষণ। তিনি বুঝেছিলেন, পূর্ব পকিস্তানে শিল্প নেই কিন্তু ব্যাপক কৃষি সম্ভাবনা আছে। আছে শিল্পের উৎপাদন সৃষ্টির, তাই কৃষি হবে ব্যাপক কর্মসংস্থান ও খাদ্য নিরাপত্তার বাহন, পদ্ধতি হবে ইউরোপীয় সমবায় ব্যবস্থাপনা, মেজর খালেদ মোশাররফের ছোট ভাই রাশেদ মোশাররফকে ইউরোপে পাঠিয়েছিলেন সমবায় পদ্ধতি অবলোকন ও অধ্যয়নের জন্য। উদ্যোগ নিয়েছিলেন মৌলিক সংস্কারের যা আজও অসম্পূর্ণ। এই ব্যর্থতার দায়িত্ব প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এড়াতে পারেন না। পরিবর্তনকে আপনি ভয় পাচ্ছেন কেন? দেশ ও দেশবাসীকে ভালোবাসাই শেখ হাসিনার শক্তি। গণতন্ত্রে আসন পরিবর্তন কোনো অলৌকিক ঘটনা নয়। প্রকৃতির নিয়ম।

দ্রুত বিপদমুক্তির জন্য সবচেয়ে বেশি সরকারী বিনিয়োগ করতে হবে বেসরকারি কৃষি উৎপাদনে, সুষ্ঠু পরিকল্পনা ও তদারকিতে উদ্বৃত্ত হয়ে ফিরে আসবে সব বিনিয়োগ। ব্যাংক খেলাপির ঝামেলায় ঘুম হারিয়ে যাবে না। শিল্পপতিদের বিশ্বাস করা যায় না, কিন্তু কৃষককে বিশ্বাস করা যায়, তারা মিথ্যাচার কম করেন, কারণ তারা ধর্মে বিশ্বাসী ও নীতিবান, তাদের ক্ষুধা সীমিত। মৎস্য, পানি সম্পদ,  পোলট্রি, স্বাস্থ্য সেবা, ডেইরি ও খাদ্য নিরাপত্তায় ব্যাপক বিনিয়োগ নিশ্চিত করুন নির্ভাবনায়। বাংলাদেশ ইনসটিটিউট অব ডেভেলপমেন্ট স্টাডিজ ও অন্যান্য গবেষণা প্রতিষ্ঠানের সজাগ তদারকির মাধ্যমে নিশ্চিত করতে হবে সঠিক নিবন্ধন, সঠিক কৃষককে সময়মত ঋণদান, সময়মত দুর্নীতিমুক্ত ঋণপ্রাপ্তি। সঙ্গে রাখুন এনজিওদের, তারা তৃণমূলে সম্পৃক্ত এবং পরিশ্রমী, ক্ষুদ্র ঋণ দ্রুত প্রসার করে নারীদের ক্ষমতায়নে ব্যাপক ভূমিকা রেখেছেন। নোবেল লরিয়েট ড. মুহাম্মদ ইউনূস, ব্রাকের প্রয়াত স্যার ফজলে হাসান আবেদ ও ‘আশা’র শফিকুল হক চৌধুরীর অবদান শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণযোগ্য।

জাফরুল্লাহ্ চৌধুরী: ট্রাস্টি, গণস্বাস্থ্য কেন্দ্র।