জি. মুনীর::বাংলাদেশে চলছে করোনাভাইরাসের সদর্পে এগিয়ে চলার প্রবণতা। দেশে করোনা সংক্রমণ ও করোনার কারণে মৃতের সংখ্যার রেকর্ড ঘোষিত হচ্ছে প্রায় প্রতিদিন। ‘করোনার চেয়েও আমরা বেশি শক্তিশালী’- সরকার পক্ষের কারো কারো এ ধরনের ঘোষণাকে ভ্রান্ত প্রমাণ করেই চলছে করোনার এই সদর্প পদচারণা। অবস্থা দেখে মনে হচ্ছে, করোনাভাইরাসই মুখ ভেঙচিয়ে আমাদের বলছে, ‘আমিই সবচেয়ে শক্তিশালী, বাকি সব শক্তি আমার কাছে নস্যি।’ হয়তো সে কথা মেনে নিয়েই প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা জাতীয় সংসদে সম্প্রতি বলেছেন, কোনো শক্তিকেই কার্যকর মনে হচ্ছে না, বরং মনে হচ্ছে করোনাভাইরাসই সবচেয়ে শক্তিশালী।

এদিকে, গণমাধ্যমে প্রকাশিত হচ্ছে করোনা মোকাবেলায় আমাদের স্বাস্থ্যসেবা ব্যবস্থাপনায় নানা নিয়ম-অনিয়ম আর দুর্বলতার কথা। আমরা এখনো জানি না, করোনার প্রাদুর্ভাব আসছে দিনে কতটা ভয়ঙ্কর রূপ ধারণ করবে। জানি না, অর্থনীতিতে কী মাত্রায় ও আকারে এর বিরূপ প্রভাব পড়বে। তবে এরই মধ্যে বিশ্বের অর্থনীতিকে স্থবির করে দিয়েছে এই করোনা। আমাদের দেশেও সে প্রভাব সুস্পষ্টভাবে দৃশ্যমান। এর অভিঘাত শেষ পর্যন্ত আমাদের কোথায় নিয়ে দাঁড় করায় সে ব্যাপারে আমরা কেউই এখনো নিশ্চিত নই। এই অনিশ্চয়তার মাঝেই অর্থনৈতিক স্বাভাবিক চর্চার পথ ধরে গত ১১ জুন অর্থমন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামাল ঘোষণা করেছেন ২০২০-২১ অর্থবছরের বাজেট। এমনি এক অস্বাভাবিক পরিস্থিতিতে জাতীয় বাজেট পেশ করা সত্যিই কঠিন কাজ। অর্থমন্ত্রী তার বাজেট বক্তৃতায় বলেছেন, তিনি বিদ্যমান সব ঝুঁকির কথা মাথায় রেখেই এই বাজেট ঘোষণা করেছেন।

কিন্তু আমাদের কাছে মনে হয় এবারের বাজেটাঙ্কগুলো নির্ধারিত রয়েছে বরাবরের মতোই। সেই অর্থে এটি একেবারই প্রচলিত ধাঁচের একটি বাজেট। এখানে উদ্ভাবনী কৌশলের অনুপস্থিতি স্পষ্টতই বিদ্যমান। এখানে করোনা মহামারীর বিশেষ পরিস্থিতির কথাটা বিবেচনায় নেয়া হয়েছে খুবই কম। এই বাজেটে পদক্ষেপ নেই সমাজে বৈষম্য কমিয়ে আনার। বিশেষ করে করোনাভাইরাসের প্রাদুর্ভাব নতুন করে যে বৈষম্য সৃষ্টি করবে, তা ঠেকানোর নেই সুনির্দিষ্ট কোনো উদ্যোগ। এই বাজেট ইতিহাসে চিহ্নিত হবে ‘করোনাকালের বাজেট’ হিসেবে। কিন্তু হয়তো ভবিষ্যতে আমরা এই বাজেটকে স্মরণ করব ‘করোনাকালের বাজেটে উপেক্ষিত করোনা-দুর্গতরা’ অভিধার এক বাজেট হিসেবে। যা-ই হোক- মনে হয়, মূল আলোচনায় যাওয়ার আগে শুরুতেই জেনে নেয়া দরকার করোনাভাইরাস আমাদের অর্থনীতিকে এরই মধ্যে কোন পরিস্থিতিতে নিয়ে দাঁড় করিয়েছে। আর কোন অর্থনৈতিক পরিস্থিতির মাঝে ঘোষিত হলো এবারের বাজেট।
২০২০ রাজস্ব বছরের প্রথম আট মাসে বাংলাদেশের অর্থনীতির প্রধান প্রধান সূচক উদ্বেগজনক বার্তা দিয়েছে। প্রবাসী আয়ের ভালো প্রবাহের কথা বাদ দিলে বাহ্যিক খাতের পরিস্থিতি নেতিবাচক। অর্থবছরের প্রথম ৮ মাসে প্রবাসী আয় বেড়েছে ২০.১ শতাংশ। তবে এই সময়ে আমদানি ও রফতানি ছিল নেতিবাচক।

দেশের রফতানি আয় কমেছে ৪.৮ শতাংশ। আমদানি কমেছে ৪.৪ শতাংশ। অর্থবছরের প্রথম ৭ মাসে ২০১৯ রাজস্ব বছরের তুলনায় প্রত্যক্ষ বিদেশী বিনিয়োগ তথা এফডিআই বেড়েছে ৪ শতাংশ। ২০২০ সালের জানুয়ারি পর্যন্ত ব্যালেন্স অব পেমেন্ট পরিস্থিতি ছিল দুর্বল। সরকারি ব্যয় ও অভ্যন্তরীণ সম্পদ সঞ্চালন ছিল ২০২০ রাজস্ব বছরের লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে কম। সামষ্টিক অর্থনৈতিক ব্যবস্থাপনা সম্পর্কে পাওয়া যাচ্ছে উদ্বেগজনক ইঙ্গিত। এ পর্যন্ত পাওয়া তথ্য-পরিসংখ্যান এরই ইঙ্গিতবহ। সরকারি অর্থায়ন সম্পর্কিত তথ্য থেকে জানা যায়, ২০২০ রাজস্ব বছরের প্রথম ৮ মাস বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচিতে (এডিপি) প্রকৃত ব্যয় ছিল মূল পরিকল্পিত ব্যয় ২০২,৭২১ কোটি টাকার ৩৮.৫ শতাংশ। এটি রাজস্ব বছর ২০১৯-এর তুলনায় ০.৩ শতাংশ কম। মোট রাজস্ব-জিডিপির অনুপাত ছিল ৯.৯ শতাংশ এবং কর-জিডিপির অনুপাত ছিল ৮.৯ শতাংশ। এর বিপরীতে সপ্তম পাঁচসালা পরিকল্পনায়, ২০২০ রাজস্ব বছরের জন্য প্রাক্কলিত এই দুই অনুপাত ছিল ১৬.১১ এবং ১৪.১ শতাংশ। ২০২০ রাজস্ব বছরের প্রকৃত সাফল্য ছিল লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে অনেক কম। প্রকৃতপক্ষে এবারের রাজস্ব লক্ষ্যমাত্রা পূরণ হওয়া সম্ভব নয়। কারণ, লক্ষ্যমাত্রা পূরণ করতে হলে ২০২০ রাজস্ব বছরের বাকি ছয় মাসে রাজস্ব সংগ্রহ বাড়াতে হবে ৮৭.৬ শতাংশ যা অসম্ভব ব্যাপার।
বলার অপেক্ষা রাখে না, করোনাভাইরাসের প্রাদুর্ভাব সরকারের রাজস্ব আয়ে এবং বেসরকারি বিনিয়োগে ব্যাপক নেতিবাচক প্রভাব ফেলেছে।

এই প্রভাব ২০২০-২১ অর্থবছরের বাজেট দিয়ে কাটিয়ে ওঠা খুবই কঠিন এক কাজ। অর্থমন্ত্রী বলেছেন, এই রাজস্ব বছরে রাজস্ব আয় কমবে ২৯ হাজার ৭৪৬ কোটি টাকা। এমনটি ধরে নিয়ে তিনি প্রস্তাবিত বাজেটের আয় ও ব্যয়ে অর্থাঙ্ক নির্ধারণ করেছেন। বাজেটে ব্যয়ের পরিমাণ ধরা হয়েছে পাঁচ লাখ ৬৮ হাজার কোটি টাকা, আয়ের পরিমাণ ধরা হয়ছে তিন লাখ ৭৮ হাজারকোটি টাকা। এই হিসাবে বাজেটে ঘাটতির পরিমাণ এক লাখ ৯০ হাজার কোটি টাকা। আর এ বাজেটে ৮.২ শতাংশ হারের একটি উচ্চাকাক্সক্ষী জিডিপি লক্ষ্যমাত্রাও ঘোষণা করেছেন। এই লক্ষ্যমাত্রা পূরণ করা হয়তো সম্ভব হতে পারে, যদি করোনাভাইরাসের প্রাদুর্ভাব আর জোরদার না হয় এবং অল্প কিছু দিনের মধ্যে তা আমাদের দেশ থেকে বিদায় নেয়। তখন অন্যান্য সূচকের উন্নতি ঘটতে পারে।
প্রস্তাবিত বাজেটের ঘাটতি পূরণের জন্য ব্যাংক খাত থেকে ৮৪ হাজার কোটি টাকারও বেশি নেয়া হবে।

সরকার বাজেট ঘাটতি মেটাতে এত বিপুল অঙ্কের টাকা ব্যাংক খাত থেকে নিয়ে গেলে ব্যাংক খাত সঙ্কটে পড়তে পারে। ব্যাংক খাতে ঋণদানের ক্ষমতা তখন সঙ্কুচিত হবে। দেখা দিতে পারে তারল্য সঙ্কট। এমনটি আশঙ্কা করা হয়েছে বেসরকারি গবেষণা সংস্থা সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ তথা সিপিডির পক্ষ থেকেও। বাজেট পর্যালোচনা নিয়ে আয়োজিত এক ভার্চুয়াল মিডিয়া ব্রিফিংয়ে সংস্থাটি ব্যাংক খাত নিয়ে এ আশঙ্কার কথা জানায়। তাদের আশঙ্কা যে অমূলক নয়, তা সহজেই অনুমেয়।
আমরা জানি, প্রকৃতপক্ষে বাংলাদেশের ব্যাংক খাতের প্রায় পুরোটাই চলে গেছে ঋণখেলাপিদের নিয়ন্ত্রণে। ঋণখেলাপিরা সবসময় কোনো না কোনোভাবে সুযোগ পেয়ে যান, তাদের হাজার হাজার কোটি টাকার খেলাপি ঋণ পরিশোধ না করেই বুক ফুলিয়ে চলার। মাত্র ২ শতাংশ এককালীন কিস্তি দিয়ে ঋণ পুনঃতফসিল করে নেয়ার সুযোগ নিয়ে দেশের বড় বড় ঋণখেলাপি হাজার হাজার কোটি টাকা ঋণ অপরিশোধিত রাখছেন। আর নিজেদের নিরাপদ রাখছেন ঋণ অনাদায়ী রাখার জবাবদিহি থেকে। অপর দিকে সরকারও প্রতি বছর অধিকমাত্রায় ঋণ নিচ্ছে ব্যাংক খাত থেকে।

এভাবে ব্যাংকগুলোকে ফেলা হচ্ছে তহবিল সঙ্কটে।
বাংলাদেশের প্রায় প্রতিটি মানুষ বাস্তব অভিজ্ঞতা দিয়ে এটুকু বোঝে, করোনাভাইরাস তাদের স্বাভাবিক আয় একেবারে তলানিতে নামিয়ে দিয়েছে। অনেকের আয়ের খাতা এখন একদম শূন্য। কারণ, লকডাউনে তাদের আয়ের উৎস বন্ধ হয়ে গেছে। অনেকের কর্মক্ষেত্র অস্তিত্ব হারিয়েছে। কেউ চাকরি হারিয়েছেন। কেউবা পড়েছেন বেতন কমিয়ে দেয়ার ফাঁদে। এই কয়টা মাস তারা কোনো মতে বেঁচে আছে ছিটেফোঁটা আয়, ত্রাণ ও ধারদেনার সাহায্যে। এখন সেসব পথও প্রায় বন্ধ হতে চলেছে। এদিকে করোনার প্রভাব আরো জোরদার হচ্ছে। ফলে তাদের হতাশার পারদ এখন ক্রমেই উপরের দিকে উঠছে। তারা হয়তো প্রত্যাশা নিয়ে দিন গুনছিল বাজেটে তাদের জন্য বড় ধরনের কিছু পদক্ষেপ নেয়া হবে। কিন্তু সে আশায় গুড়ে বালি। বাজেটে করোনা-দুর্গতদের জন্য নেই কোনো বিশেষ পদক্ষেপ।
বলাবাহুল্য, করোনাভাইরাসের বিরূপ প্রভাবে রুজি-রোজগার হারিয়ে হতাশায় নিমজ্জিত মানুষের সংখ্যা নেহায়েত কম নয়। বেসরকারি সেবা সংস্থা ব্র্যাক গত সপ্তাহে একটি জরিপ প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে। বিগত এপ্রিল ও মে মাসে পরিচালিত এই জরিপ মতে, জরিপে অংশ নেয়া ৬৭ শতাংশ মানুষ বলেছে, এরা এখন নতুন করে গরিব হয়েছে। এর আগে গরিব ছিল না। আর তাদের এই গরিব হওয়ার কারণ, করোনার অভিঘাতে পড়ে কাজ হারানো। জরিপে আরো বলা হয়, করোনার প্রাদুর্ভাবের প্রথম দিকে ৯৫ শতাংশ পরিবারের আয় কমে যায়।

এই হার ৭৬ শতাংশে নামে এপ্রিল ও মে মাসে। অধিকন্তু, জরিপ মতে ৫১ শতাংশ পরিবারের আয় একদম শূন্যে নেমে গেছে। জরিপে অংশ নেয়া ৬২ শতাংশ মানুষ জানিয়েছে, তারা করোনার কারণে চাকরি হারিয়েছে। আর ২৮ শতাংশ অর্থনৈতিকভাবে নিষ্ক্রিয় হয়ে পড়েছে।
বাজেটে করোনার বিরুদ্ধে লড়াইয়ের নানা উদ্যোগের কথা বলা হয়েছে, তবু বাজেটে শহুরে গরিব মানুষের জন্য কোনো কর্মসূচির উল্লেখ নেই। এরা গরিবের দলে অন্তর্ভুক্ত হয়েছে ২৬ মার্চ থেকে ৩০ মে পর্যন্ত সাধারণ ছুটি চলাকালে।
বাজেটে সরকার প্রস্তাব করেছে সামাজিক নিরাপত্তা জালকে খাতে ৯৫ হাজার ৫৭৪ কোটি টাকার বরাদ্দ, যা বাজেটের ১৬.৮৩ শতাংশ। বলা হয়েছে সামাজিক নিরাপত্তা জালকে সম্প্রসারণ করা হবে বয়স্ক-ভাতা, বিধবা-ভাতা, স্বামীপরিত্যক্তা নারী-ভাতা এবং পঙ্গু ও অসচ্ছল ব্যক্তি-ভাতা কর্মসূচি জোরদার করে। কিন্তু নতুন সৃষ্ট গরিবদের জন্য কোনো বরাদ্দ নেই।
এদিকে অর্থনীতিবিদরা বলছেন, বেশ কিছু খাতে শুল্ক ও ভ্যাট আরোপের ফলে মানুষের জীবনযাপন আরো কঠিন হয়ে পড়বে। কারণ এতে মানুষের ক্রয়ক্ষমতা কমে যাবে। যাদের গত তিন মাসে স্বাভাবিক আয় কমে গেছে, এদের জীবনযাপনও কঠিন হবে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতির অধ্যাপক ড. রুমানা হক বলেছেন, সরকার কৃষক ও তৈরী পোশাক শ্রমিকদের জন্য কিছু প্রণোদনা ঘোষণা করেছে, কিন্তু চলমান করোনা মহামারীর কারণে যারা দারিদ্র্যসীমার নিচে নেমে গেছে তাদের জন্য কোনো পদক্ষেপের উল্লেখ বাজেটে নেই।
কনজিউমার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (ক্যাব)-এর সভাপতি গোলাম রহমান বলেছেন, করবহির্ভূত আয়ের সীমা বাড়ানোর ফলে মানুষ কিছুটা উপকৃত হলেও করোনাভাইরাসের প্রভাবে যারা আয়ের পথ হারিয়েছে, তাদের জন্য কোনো পদক্ষেপ নেই এবারের বাজেটে। এটি একটি বিস্ময়কর ব্যাপার। তিনি বলেন, এই বাজেট জনগণের ওপর বোঝা আরো বাড়িয়ে দিয়েছে।
একই ধরনের অভিমত রেখেছেন, বাংলাদেশ অর্থনীতি সমিতির সভাপতি অর্থনীতিবিদ ড. আবুল বারাকাত। তিনি দাবি করেন, এই করোনার সময় প্রায় তিন কোটি ৬০ লাখ মানুষ তাদের কাজ হারিয়েছে। এই লকডাউনের আগে এর ৩০ শতাংশ ছিল গরিব। আর এখন এরা সবাই গরিব। তিনি বলেন, যাদের জন্য বাজেটীয় উদ্যোগ প্রয়োজন, তারা এ বাজেট থেকে কোনো উপকার পাবে না।
এদিকে এবারের বাজেটে যেসব ব্যাংক হিসাবধারীর আমানতের পরিমাণ ১০ লাখ টাকার বেশি থাকবে, তাদের আবগারি কর বাড়ানো হয়েছে। ফলে অনেক আমানতকারী ক্ষতিগ্রস্ত হবে। একসময় ব্যাংক হিসাবধারীর আমানতের পরিমাণ ১০ লাখের ওপর চলে গেলে এবং এ পরিমাণ এক কোটি টাকার নিচে হলে তার আবগারি কর বাড়বে ৫০০ টাকা। আর আমানতের পরিমাণ এক কোটি থেকে ছয় কোটি হলে আবগারি কর কাটা হবে তিন হাজার টাকা। আর কোনো ব্যাংক হিসাবে আমানত স্থিতির পরিমাণ পাঁচ কোটি টাকার উপরে হলে তাদের এই কর দিতে হবে ৪০ হাজার টাকা। আগে এর পরিমাণ ছিল ২৫ হাজার টাকা।

উল্লেখ্য, গত ডিসেম্বরের শেষ দিন পর্যন্ত দেশে ব্যাংক হিসাব ছিল ১০৬,৫০০.০০০টি। আর এদের ব্যাংক হিসাবে জমার পরিমাণ ছিল ১২.১৪ লাখ কোটি টাকা। এমনিতেই ব্যাংকে টাকা রাখার প্রতি গ্রাহকদের অনীহা ক্রমেই বাড়ছে, এমন বাজেটীয় পদক্ষেপ এই অনীহার মাত্রা আরো বাড়িয়ে তুলবে। এর বিরূপ প্রভাব পড়বে সার্বিক ব্যাংক ব্যবসায়ের ওপর।
এদিকে বাজেটে করবহির্ভূত আয়ের সীমা বাড়ানো হয়েছে। পাঁচ বছরের মধ্যে সরকার এই প্রথমবারের মতো করবহির্ভূত আয়ের সীমা ৫০ হাজার টাকা বাড়িয়ে তা নির্ধারণ করল বছরে তিন লাখ টাকা। সরকার অবশ্য বলছে, করোনাভাইরাসের কারণে জনগণের ওপর সৃষ্ট অর্থনৈতিক বোঝা লাঘরের উদ্দেশ্যেই এই পদক্ষেপ নেয়া হয়েছে। কিন্তু জনগণের ওপর চাপানো হয়েছে পণ্যমূল্যের বোঝা। কারণ, লবণ ও পেঁয়াজের ওপর আমদানি শুল্ক বাড়ানোর কারণে এগুলোর দাম বাড়বে। তবে রসুন ও চিনির ওপর আমদানি শুল্ক কমানো হয়েছে। অপর দিকে সাধারণ মানুষকে ক্ষতিগ্রস্ত করবে মোবাইল ফোন সার্ভিস- ভয়েস কল, এসএমএস ও ডাটার ওপর সম্পূরক কর ৫ শতাংশ বাড়ানোর পদক্ষেপ।

বিটিআরসির দেয়া তথ্যমতে, বায়োমেট্রিক উপায়ে পরীক্ষিত মোবাইল গ্রাহকের সংখ্যা ১৬৫,৩০০.০০০।
দুঃখজনক হলেও উল্লেখ করতে হয়, এবারের বাজেটের মাধ্যমে কালো টাকা অর্জনের উপায়কে আরো লোভনীয় করে তোলা হয়েছে। সরকারের ভাবটা যেন এমন- ‘হোক না কালো টাকা, বিনিয়োগ করো।’ আয়কর কর্তৃপক্ষও এই কালো টাকার উৎস সম্পর্কে কোনো প্রশ্ন তুলবে না।
পাঁচ বছর ধরে কালো টাকার মালিকরা তাদের কালো টাকা সাদা করার সুযোগ পেয়েছে আবাসিক ভবন ও অন্যান্য ক্ষেত্রে বিনিয়োগ করে। এই সুযোগ ছিল শুধু তাদের জন্য, যারা অন্যান্য বছর এই টাকার কর দেয়নি। বিগত প্রায় সব রাজস্ব বছরে এই সুযোগ দেয়া হয় তাদেরও যারা কালো টাকা বিনিয়োগ করবে অর্থনৈতিক অঞ্চল ও হাইটেক পার্কে।
২০২০-২১ রাজস্ব বছরে কালো টাকা সাদা করার সুযোগ আরো সম্প্রসারিত করা হয়েছে।

এই সুযোগের আওতায় ‘যেকোনো ধরনের’ কালো টাকা সাদা করার পথ খোলা রাখা হয়েছে। এখন ২০২০ সালের ১ জুলাই থেকে ২০২১ সালের ৩০ জুন পর্যন্ত সময়ে যেকোনো করদাতা তার অঘোষিত সম্পদ বৈধ করার সুযোগ পাবে শুধু প্রতি বর্গফুটে নির্দিষ্ট পরিমাণ কর পরিশোধ করে; অঘোষিত নগদ টাকা, ব্যাংক আমানত, সেভিংস সার্টিফিকেট, শেয়ার, বন্ড অথবা অন্য কোনো ঋণপত্র ১০ শতাংশ কর দিয়ে সাদা করে নিতে পারবে এবং কালো টাকা শেয়ারবাজারে বিনিয়োগ করতে পারবে বিনিয়োগ-মূল্যের ওপর ১০ শতাংশ কর দিয়ে। অর্থমন্ত্রী তার বাজেট বক্তৃতায় বলেছেন, আয়কর কর্তৃপক্ষসহ কেউই এই ঘোষিত কালো টাকা সম্পর্কে কোনো প্রশ্ন তুলতে পারবে না। তিনি বলেছেন, বিশেষ বিশেষ সময় বিশেষ বিশেষ পদক্ষেপ দাবি করে।