করোনাভাইরাস আতঙ্কে টানা ৭২ দিন পর ১ জুন থেকে শুরু হয়েছে ছোট পর্দার শুটিং, কাজের প্রস্তুতি চলছে বড় পর্দায়ও। শুটিংয়ে অংশ গ্রহণকারীরা বলছেন সব ধরণের স্বাস্থ্যবিধি মেনেই কাজ শুরু হয়েছে। তবে দ্বিমতও আছে অনেকের। টেলিভিশন নাটকের কাজ শুরুর আগে শুটিংয়ের নিরাপত্তা দেখভালের জন্য মনিটরিং সেলের কথা আন্তসংগঠন থেকে বলা হলেও সে নির্দেশনা থেকে পিছিয়ে এসেছে তারা। এখন কোনো রকম মনিটরিং ছাড়াই হবে টেলিভিশন নাটকের শুটিং।

পরিচালক সমিতির সভাপতি মুশফিকুর রহমান গুলজার জানান, ‘আমরা সরকারের নির্দেশেই শুটিং বন্ধ করেছিলাম। এখন সরকার যেহেতু সব খুলে দিচ্ছে, তাই আমাদের লোকজনকে বলব, যারা স্বাস্থ্যবিধি মেনে কাজ করতে পারবেন, তারা কাজ করবেন। দু-একদিনের মধ্যেই আমরা আনুষ্ঠানিক সিদ্ধান্ত জানাব।’

লকডাউনে দীর্ঘ সময় চলচ্চিত্রের শুটিং বন্ধ থাকায় প্রযোজকদের লগ্নি আটকে আছে। অনেক নির্মাতার চলচ্চিত্রের কাজ অসমাপ্ত রয়ে গেছে। চলচ্চিত্র মানেই তো বিশাল শুটিংবহর, লাইট-ক্যামেরা-অ্যাকশনের রঙিন ঝলমলে দুনিয়া। এদিকে করোনাক্রান্তের সংখ্যা বৃদ্ধির সাথে সাথে মৃত্যুর মিছিলও দীর্ঘ হচ্ছে। এমন পরিস্থিতিতে শুটিং শুরু হলেও কীভাবে কাজ করবেন, এ বিষয়ে কথা হয় একাধিক নির্মাতার সাথে।

নির্মাতাদের অনেকেই ইউনিট ছোট রেখে কাজ শুরুর কথা জানিয়েছেন। আবার কেউ কেউ এখনই শুটিং করবেন না বলে জানান।

ইউনিট ছোট রেখে কাজ শুরুর ইচ্ছা প্রকাশ করেছেন নির্মাতা সৈকত নাসির। এ নির্মাতার ‘ক্যাসিনো’ চলচ্চিত্রের শুটিং শেষ হলেও থেমে আছে অন্যান্য কাজ। হাতে আছে নতুন চলচ্চিত্র। তিনি মনে করেন এ মহামারী দীর্ঘস্থায়ী হবে। তাই অপেক্ষা না করে স্বাস্থ্যবিধি মেনে কাজে নেমে পড়ার বিকল্প নেই জানিয়ে তিনি বলেন, ‘আমাদের কাজ করতে হবে। কাজ করা ছাড়া তো আসলে উপায় নেই। আমার সর্বোচ্চ চেষ্টা থাকবে ইউনিটটা ছোট রেখে কাজ করা। সবার নিরাপত্তার জন্য যা যা করা প্রয়োজন তা করতে হবে।’

নির্মাতা অনন্য মামুনের ‘সাইকো’ ছবির শুটিং হয়েছে অর্ধেকের মতো। লকডাউনের আগে ‘মেকআপ’ নামে আরেকটি ছবির শুটিং শেষ করলেও বাকি ছিল শব্দ গ্রহণ ও সম্পাদনার কাজ। শুটিং শুরু নিয়ে অনন্য মামুন বলেন, ‘আমরা যে অবস্থায় আছি, তাতে জাদুর দুনিয়ার মতো সবকিছু এক নিমেষে স্বাভাবিক হয়ে যাবে না। এটা দীর্ঘস্থায়ী সমস্যা। কাজেই সবাইকে চিন্তা করে একটি পথ বের করতে হবে, কীভাবে আমরা সামনের দিনগুলোয় এগিয়ে যাব। এ পরিস্থিতিতে সবচেয়ে উপযোগী পদ্ধতিটি আমাদের বের করতে হবে।’ খুব দ্রুত কাজ শুরু করতে চান বলে তিনি জানান।

তবে এখনই শুটিং শুরু নিয়ে ভিন্নমত পোষণ করেন ‘ভয়ংকর সুন্দর’ ছবির পরিচালক অনিমেষ আইচ। ব্যক্তিগতভাবে বড় পরিসরে এ সময় কাজ করতে চান না এ নির্মাতা। কিন্তু যারা করতে চান, তাদের স্বাগত জানিয়ে তিনি বলেন, ‘আমি ব্যক্তিগতভাবে এখন শুটিংয়ে যাব না। যারা শুটিং করতে যাচ্ছেন, তাদের দোষ দেয়ার সুযোগ নেই। শিল্পীদের মাসিক বেতন নেই। যিনি পরিচালনা করে আয় করেন, যারা মেকআপ দিয়ে বা অভিনয় করে জীবন চালান, তাদের তিন মাস ধরে কোনো আয় নেই। অনেকেই জীবনের ঝুঁকি নিয়ে কাজ করবেন। দোয়া করি সবাই নিরাপদে থাকুক।’

এ সময় শুটিং শুরু করলে কীভাবে কাজ করতেন জানতে চাইলে অনিমেষ বলেন, ‘সেক্ষেত্রে আমি খুব ছোট ইউনিটে কাজ করব। মেকআপ ম্যান, প্রডাকশন বয়, লাইট ক্রু থাকবে না। ক্যামেরায় এক-দুজন থাকবে। শুটিং এমন একটা কাজ, এটা ঠিক ডেস্কে বসে চাকরির মতো না। শুটিংয়ের প্রয়োজনে জড়িয়ে ধরতে হবে, কাছে আসতে হবে। পরিচালককেও কাছে গিয়ে বুঝিয়ে দিতে হবে। সব মিলিয়ে আসলে দূরত্ব বজায় রাখার সুযোগ নেই। তাই গল্প ভাবনার ক্ষেত্রেও পরিবর্তন আনতে হবে।’
অনিমেষের মতোই আপাতত কিছুদিন অপেক্ষা করতে চান নির্মাতা রায়হান রাফি। বড় পর্দার কাজ কিছুদিন বন্ধই রাখতে চান তিনি। তবে এ সময়টায় তিনি স্বল্পদৈর্ঘ্যে চলচ্চিত্র নির্মাণের কথা জানান। নিজের কাজ নিয়ে রাফি বলেন, ‘আমি অন্তত আরো মাসখানেক অপেক্ষা করব। আমি চাই না আমার ইউনিটে কেউ আক্রান্ত হোক। কভিড-১৯-এর সমস্যাটা বিশ্বব্যাপী। আমাদের পাশের দেশ আছে, তারা কেমন করে শুটিং করে সেটাও পর্যবেক্ষণ করা যেতে পারে।’

অভিনয় একটা শিল্প। তাই শিল্পীকে স্বতঃস্ফূর্ত থাকতে হয়। আতঙ্ক নিয়ে আর যাই হোক অভিনয় করা যায় না বলে মনে করেন রায়হান রাফি। তবে যারা শুটিং শুরু করতে চাচ্ছেন তাদের উদ্দেশে তিনি বলেন, ‘কেউ যদি ইউনিটের সবার নিরাপত্তা দিয়ে স্বাস্থ্যবিধি রক্ষা করে শুটিং করতে পারেন তাহলে খুবই ভালো। আমি স্বাগত জানাই।’

এদিকে শুটিং শুরুর ঘোষণা এলে শুটিং হাউসমালিকদের মধ্যে ক্ষতি থেকে বাঁচতে কিছুটা স্বস্ত্বি ফিরে আসে। যেহেতু রাস্তাঘাটে শুটিং করা সম্ভব নয়, এমন অবস্থায় শুটিং বাড়িগুলোই ভরসা। তবে এমন পরিস্থিতিতে তারা নিয়মিত শুটিং বাড়ির বুকিং হওয়া নিয়ে শঙ্কার মধ্যে আছেন। খোঁজ নিয়ে জানা যায়, শুটিং শুরুর প্রথম দুই দিনে উত্তরার আপনঘর-১, পুবাইলে হারুনের বাড়িসহ আরো শুটিংবাড়িতে দৃশ্য ধারণ হয়েছে। এই শুটিং চলবে টাকা তিন থেকে ছয় দিন।