এ এম এম নাসির উদ্দিন::

করোনা কবলিত এবারের পাংশে ঈদ যতটা না আমাকে মানসিক যন্ত্রণা দিচ্ছে তার চাইতে ঢের বেশি আমার মনোবেদনার কারণ হয়ে দেখা দিয়েছে আম্পান কবলিত উপকূলীয় এলাকার সর্বস্ব হারানো লোকজনের দুর্গতি। মিডিয়ায় দেখলাম জলোচ্ছ্বাস কবলিত খুলনার কয়রা উপজেলার কয়েকশ’ লোক হাঁটু পানিতে দাঁড়িয়ে ঈদের নামাজ আদায় করছেন। আম্পান সৃষ্ট জলোচ্ছ্বাস তাদের ঘরবাড়ি, ক্ষেত-খামার, সহায় সম্পদ সব ভাসিয়ে নিয়ে গেছে। আম্পান-এর পর এক সপ্তাহ পার হলেও জোয়ারের পানিতে প্রতিদিন তলিয়ে যাচ্ছে তাদের বসতভিটা যা আবার ভেসে ওঠে ভাটার টানে। এ লোকগুলোর এখন ঘরবাড়ি নেই, চাল চুলো নেই, নেই বেঁচে থাকার কোন অবলম্বন। এরাও মানুষ, এ দেশেরই নাগরিক যারা অন্য দশজনের মতোই সম্মানের সাথে বাঁচার অধিকার রাখেন। আম্পানের তান্ডবে বাঁধ ভেঙে সৃষ্ট জলোচ্ছ্বাসে সপ্তাহ খানেক আগে সাতক্ষীরা, বাগেরহাট, বরগুনা, পটুয়াখালী ইত্যাদি জেলার উপকূলীয় অঞ্চলে ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়, ভাসিয়ে নিয়ে যায় মানুষের ঘরবাড়ি, ক্ষেত-খামার, হাজারো মাছের ঘের। বরাবরের মতোই দুর্গতদের একমাত্র দাবি উপযুক্ত স্থায়ী বেড়িবাঁধ।

করোনার ডামাডোলে এ লোকগুলোর আকুতি,আর্তি হয়তো বা অনেকটা ম্রিয়মান।

ঈদের আনন্দ, করোনার ভীতি এদের কাছে একদম অপ্রাসঙ্গিক। সামাজিক দূরত্ব বা হাত ধোয়া ইত্যাদির কোনো আবেদন তাদের কাছে নেই। উপকূলীয় এলাকায় জলোচ্ছ্বাস নতুন কিছু নয়। বছরের পর বছর ধরে এসব এলাকার লোকজন প্রতিনিয়ত এরূপ পরিস্থিতির শিকার হচ্ছেন। অভিজ্ঞতা না থাকলে এদের এই দুর্দশার ব্যপ্তি, মাত্রা ও গভীরতা বুঝা যাবেনা। উপকূলীয় এক দ্বীপে আমার জন্ম ও বেড়ে ওঠা। জলোচ্ছ্বাসের সাথে পরিচিতি আমার বাল্যকাল থেকেই। জীবনে বহু ঘূর্ণিঝড়ের তান্ডব সরাসরি প্রত্যক্ষ করেছি। ১৯৬০, ১৯৬৩, ১৯৬৫, ১৯৭০, ১৯৮৫, ১৯৯১, ১৯৯৭, ২০০৭ (সিডর) এবং ২০০৯ (আইলা) এর ঘুর্ণিঝড় যে তান্ডব চালিয়েছে তা দেখেছি।

কিন্তু দুর্ভাগ্যজনকভাবে আমরা এসব ঘুর্ণিঝড় থেকে শিক্ষা নিয়ে জলোচ্ছ্বাস থেকে উপকূলীয় অঞ্চলের লোকজনকে রক্ষার পর্যাপ্ত ব্যবস্থা নিতে পারিনি। ঘুর্ণিঝড় অনেক হয়েছে এবং হয়ত আরো হবে। গত সপ্তাহের জলোচ্ছ্বাসের জন্যে ঘুর্ণিঝড় আম্পানের উপর দায় চাপিয়ে কি আমরা পার পেয়ে যেতে পারি? এর জন্যে রাষ্টের কি কোন দায় নেই? ভাঙ্গণ ও জলোচ্ছ্বাসপ্রবণ এলাকার দুর্বল ও ভাঙা বেড়িবাঁধ কেন যথাসময়ে নির্মাণের ব্যবস্থা নেয়া হলো না? যথাসময়ে যথোপযুক্ত স্থায়ী বেড়িবাঁধ নির্মিত হলে আজ এত লোকজনকে সর্বস্বান্ত হতে হতো না।

স্থায়ী টেকসই বেড়িবাঁধ-এর অভাবেই মূলত সামুদ্রিক জলোচ্ছ্বাসজনিত দুর্ভোগ নিয়মিত পোহাতে হচ্ছে উপকূলীয় এলাকার অধিবাসীদের। এই এলাকার বাসিন্দাদের প্রধান এবং প্রাণের দাবি স্থায়ী টেকসই বেড়িবাঁধ। যুগ যুগ ধরে এ দাবিই জানিয়ে আসছে উপকূলীয় অঞ্চলের জনগণ। নড়াইল, যশোর জেলা থেকে কক্সবাজার জেলা পর্যন্ত ১৯টি জেলার অধীনস্থ প্রায় ৪৭,২০০ বর্গ কিলোমিটার (যা দেশের মোট আয়তনের প্রায় ৩২%) এলাকা উপকূলীয় অঞ্চলের অন্তর্ভুক্ত। প্রায় সাড়ে তিন কোটি লোকের (৩৫ মিলিয়ন) বসবাস এ অঞ্চলে ভোলা, হাতিয়া,সন্দীপ, মহেশখালী, কুতুবদিয়া, সেন্ট মার্টিনসহ ছোট বড় প্রায় ৭০টা দ্বীপের অবস্থানও এ অঞ্চলে। আমাদের ঈড়ধংঃ ষরহব প্রায় ৭১০ কিলোমিটার। উপকূলীয় পশ্চিমাঞ্চলের ৬০১৭ বর্গকিলোমিটার এলাকা জুড়ে রয়েছে সুন্দরবন ম্যানগ্রোভ বনাঞ্চল যা অতন্দ্র প্রহরীর মত সুরক্ষা দিয়ে যাচ্ছে বাংলাদেশকে। খাদ্যশস্য , মাছ, তরিতরকারি, লবণ ইত্যাদির সিংহভাগ যোগান দিচ্ছে উপকূলীয় অঞ্চল।

দুর্ভাগ্যজনকভাবে স্থায়ী টেকসই বেড়িবাঁধ-এর অভাবে এ অঞ্চলের ব্যাপক সংখ্যক মানুষ প্রতি বছর সামুদ্রিক জলোচ্ছ্বাসের শিকার হচ্ছে এবং তাদের ঘরবাড়ি, ক্ষেত-খামার, সহায় সম্বল হারিয়ে সর্বস্বান্ত হচ্ছে। জলবায়ু পরিবর্তন এবং সমুদ্র পৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধিজনিত কারণে মানুষের দুর্ভোগ আরো বাড়বে। এক হিসেবে দেখা গেছে ১৯৯৫ সাল থেকে ২০১৫ সালের মধ্যে বিশ বছরে প্রায় ২৪০০ বর্গকিলোমিটার এলাকা সমুদ্রে বিলীন হয়েছে। প্রতি বছর সরকার শত শত কোটি টাকা বরাদ্দ দেয়, বহু প্রকল্প গৃহীত হয় যা চুড়ান্ত বিশ্লেষণে উপকূলবাসীর দুর্দশা লাঘবে সমর্থ হয়নি।বাঁধ নির্মাণ কাজে ব্যাপক অনিয়মের অভিযোগ, জরুরি মেরামতের নামে অর্থের অপচয়, যথাযথ মান সম্পন্ন বেড়িবাঁধ নির্মাণ না করা, যথাসময়ে নির্মাণ কাজ সম্পন্ন না করা, এগুলো সর্বজন বিদিত।বিশ্বব্যাংকের সহায়তায় উপকূলীয় বেড়িবাঁধ নির্মাণে মেগা প্রকল্প গ্রহণের কথাও শুনা যাচ্ছিল। কিন্তু বাস্তবায়ন দেখছি না। প্রকল্প নির্বাচনে আমাদের অগ্রাধিকার নির্ধারণ পুনর্বিবেচনা করতে হবে।

আমাদের স্বপ্নের পদ্মা সেতু, স্যাটেলাইট প্রকল্প, মেট্রোরেল, নতুন বিমানবন্দর প্রকল্প ইত্যাদি গুরুত্বপূর্ণ প্রকল্প হলেও উপকূলীয় এলাকার ভুক্তভোগী জনগণের কাছে এগুলো অর্থহীন। তারা জলোচ্ছ্বাস থেকে বাঁচতে চায়, জীবন জীবিকা, সহায় সম্পদ রক্ষার প্রকল্প চায়। স্থায়ী টেকসই বেড়িবাঁধ নির্মাণের প্রকল্প চায়। এমতাবস্থায় যা করতে হবেঃ

১। উপকূলীয় দ্বীপসমূহ এবং সমগ্র উপকূলীয় এলাকায় টেকসই স্থায়ী বেড়িবাঁধ নির্মাণের জন্যে মেগা প্রকল্প গ্রহণ করতে হবে। যে দেশ নিজস্ব অর্থায়নে হাজার হাজার কোটি টাকার পদ্মা সেতু বানাতে পারে, সে দেশের পক্ষে এরূপ মেগা প্রকল্প বাস্তবায়ন অবশ্যই সম্ভব। বর্তমানে বাস্তবায়নাধীন মেগা প্রকল্পসমুহ ছাড়া অন্য নতুন বড় অবকাঠামো প্রকল্প আপাতত গ্রহণ না করে উপকূলীয় বেড়িবাঁধ নির্মাণ মেগা প্রকল্প জরুরি ভিত্তিতে গ্রহণ করতে হবে।

২। পানি উন্নয়ন বোর্ডের পক্ষে এ জাতীয় মেগা প্রকল্প যথাযথ বাস্তবায়ন সম্ভবপর হবেনা। অতীত অভিজ্ঞতা তাই বলে। সকল কাজের কাজী পানি উন্নয়ন বোর্ডকে এ প্রকল্পের দায়িত্ব না দিয়ে এর জন্যে স্বতন্ত্র কর্তৃপক্ষ গঠন করতে হবে যার নাম হতে পারে “উপকূলীয় বেড়িবাঁধ কর্তৃপক্ষ “। যমুনা সেতু (বঙ্গবন্ধু সেতু) প্রকল্প, ঢাকা শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর নির্মাণ প্রকল্প সুষ্ঠুভাবে বাস্তবায়ন-এর জন্যে আলাদা আলাদা কর্তৃপক্ষ গঠন করা হয়েছিল। অনুরূপভাবে শুধুমাত্র উপকূলীয় বেড়িবাঁধ নির্মাণ মেগা প্রকল্প বাস্তবায়ন ও বেড়িবাঁধ রক্ষণাবেক্ষণের জন্যে আলাদা কর্তৃপক্ষ গঠন করতে হবে। আশা করি সাড়ে তিন কোটি উপকূলবাসীকে রক্ষায় প্রস্তাবিত মেগা প্রকল্প জরুরিভিত্তিতে গৃহীত হবে এবং এর সুষ্ঠু বাস্তবায়নের লক্ষে প্রস্তাবিত আলাদা কর্তৃপক্ষ গঠিত হবে।
লেখক: সাবেক সচিব