গ্রিসে অবৈধ বাংলাদেশির সংখ্যা লাখের বেশি। জীবনের ঝুঁকি নিয়ে সাগর পথ পাড়ি দিয়ে ইউরোপে যান তারা। এসব বাংলাদেশির বেশিরভাগই দালালদের খপ্পরে পড়ে নিজের শেষ পরিচয়পত্র পাসপোর্টটিও হারান। নাম পরিচয়হীন এসব মানুষের নেই কোনো কাজের স্বীকৃতি।

ফলে অধিকাংশই ছোটখাটো কাজ করে লুকিয়ে থেকে অজানা শঙ্কায় জীবন পার করছেন। তার ওপর দেশটির অর্থনৈতিক মন্দায় এখন আরও দিশেহারা অবৈধ পথে স্বপ্নের ইউরোপে আসা এসব মানুষ। এ ছাড়া কত বাংলাদেশি দেশটির কারাগারে মানবেতর জীবন কাটাচ্ছে তার কোনো সঠিক হিসেব নেই।

সম্প্রতি গ্রিসের কারাগারে এক বাংলাদেশির মৃত্যু হয়েছে। দেশটির করিদালো কারাগার থেকে মৃতের নাম খান জুনাত, পিতা নুতু খান ও মা আসেয়া ছাড়া আর কোনো ঠিকানা পাওয়া যায়নি।

স্থানীয় পুলিশ বলেছে, তিনি অবৈধ অভিবাসী হওয়ায় কোনো ঠিকানা বা আইডি বহন করেননি। আটকাবস্থায় অসুস্থ হয়ে তিনি মৃত্যুবরণ করেন।

তার মরদেহ হস্তান্তর করতে ঠিকানা চেয়েছে দেশটির বাংলাদেশ কমিউনিটির নেতাকর্মীরা। কেউ তার পরিচয় জেনে থাকলে নিচের নম্বরে যোগাযোগ করার অনুরোধ জানানো হয়েছে দেশটির কমিউনিটির পক্ষ থেকে। আব্দুল কুদ্দুস 6946407102।

গ্রিসে অবস্থানরত বেশ কয়েকজন জানান, বৈধ কাগজপত্র না থাকায় ফ্রান্স ও জার্মানির পথে হাঁটছে অনেক প্রবাসী। এ ছাড়া ইদানিং দেশটির আইন কঠিন হওয়ায় প্রবাসীদের বিপদ যেন পিছু ছাড়ছে না। পুলিশের হাতে ধরা পড়ে কারাগারের অন্ধকার কুঠিরে ঠাঁই হচ্ছে অনেকের।

মহাকাশ থেকে যেমন ফিরে আসার নিশ্চয়তা কম তেমনি সাগরপথ থেকে গন্তব্যে যাওয়ার সম্ভাবনাও কম। তবু যেন মানুষ ভাগ্য পরিবর্তনের আশায় মৃত্যুর কাফন বুকে জড়িয়ে ভূমধ্যসাগর জয় করার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন। নিশ্চিত বিপদ জেনেও একশ্রেণির মানুষ বারবার পা বাড়াচ্ছেন মৃত্যুকূপে।

ইউরোপের অন্যতম প্রবেশপথ স্পেন সফর করে করে বিভিন্ন দালালের মাধ্যমে স্পেনে যারা এসেছেন তাদের সঙ্গে আলাপে জানা যায়, বর্তমানে মানব পাচারকারী দালাল চক্ররা এখন ইউরোপে ঢোকার জন্য যুদ্ধবিধস্ত লিবিয়াকে নিরাপদ রুট হিসেবে ব্যবহার করছে। দালালদের মাধ্যমে আসা বেশিরভাগ বাংলাদেশি চেষ্টা করেন লিবিয়া হয়ে ভূমধ্যসাগর পাড়ি দিয়ে তুরস্ক হয়ে ইউরোপের দেশ গ্রিস কিংবা ইতালিতে অনুপ্রবেশের।

এর মধ্যে আবার কেউ কেউ অবৈধভাবে প্রবেশের চেষ্টাকালে আইন-শৃংখলা বাহিনীর হাতে গ্রেফতার হয়ে কারাগারে বন্দিজীবন কাটাচ্ছেন। আবার দালালের খপ্পরে পড়ে অনেকে জিম্মি জীবন যাপন করছেন। মুক্তির জন্য দেশ থেকে ভিটেমাটি বিক্রি করে টাকা-পয়সা দিয়েও মিলছে না তাদের মুক্তি।

আফ্রিকা ও আরবের বিভিন্ন দেশ থেকে তুরস্ক কিংবা গ্রিসে নৌপথে লিবিয়া হয়ে ভূমধ্যসাগর কিংবা আটলান্টিক মহাসাগর স্পিডবোট কিংবা ট্রলার দিয়ে পাড়ি জমানোর সময় সলিল সমাধি হচ্ছে অনুপ্রবেশকারীদের। আবার আফ্রিকার দেশ মরোতানিয়া রটে সাহারা মরুভূমি হয়ে পর্তুগাল ঢোকার চেষ্টাকালে সাহারা মরুভূমির দুর্গম পথ পাড়ি দিতে গিয়ে অনাহারে অনেকে মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়েন।

ইউরোপে ঢোকার আরেক পথ হলো আলজেরিয়া থেকে মরোতানিয়া হয়ে সাহারা মরুভুমি পর মরক্কো হয়ে পর্তুগাল। এই রুটের সবচেয়ে ভয়ানক পথ হলো সাহারা মরভূমি। এই সাহারা মরুভূমি পায়ে হেঁটে পাড়ি দিতে হয়। সাহারা মরুভূমি পায়ে হেঁটে পাড়ি দিতে প্রায় এক সপ্তাহ লেগে যায়।

এক সপ্তাহের পায়ে হাঁটার পথে পানাহারের জন্য দু‘বোতল তরল পানি ছাড়া আর কিছু বহন করতে দালাল চক্র নিরাপদ মনে করে না। দালালরা যাত্রীদের তাড়াতাড়ি পথ পাড়ি দেয়ার জন্য চাপ সৃষ্টি করে। সাহারা মরুভূমিতে যখন যাত্রীরা পথ পাড়ি দিতে রওয়ানা হন তখন তাদের অনুসরণ করতে থাকে অন্য দালাল সদস্যরা।

আইন-শৃংখলা বাহিনীর চোখ ফাঁকি দিয়ে চলতে থাকে দুর্গম পথ পাড়ি দেওয়ার প্রয়াস। অনেক সময় এই পথ এক সপ্তাতে শেষ হয় আবার পথে ঝামেলা হলে বিলম্ব হয়। যাত্রাপথে পানি শেষ হলে শুরু হয় যাত্রীদের আর্তনাদ। প্রচণ্ড গরমে হাহাকার করতে করতে অনেকে শেষ নিশ্বাস ত্যাগ করে। এরপর শুরু হয় দিন গোনা কবে ঢুকতে পারবেন স্বপ্নের ইউরোপে।